তাছাওউফের দলীল ও তরীকতের বাইয়াত
মুসলিম শরীফে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর মাধ্যমে বর্ণিত ‘হাদীসে জিবরাঈলে’ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম কর্র্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে যে প্রশ্ন করা হয় তার জবাবে রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উত্তর দেন তা হলো- فاخبرني عن الاحسان قال ان تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك- الحديث ( مسلم অর্থাৎ আপনি আমাকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে বলুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত কর যেন (ইবাদত করা অবস্থায়) তাঁঁকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তাঁকে দেখতে না পাও তাহলে (মেনে নাও) তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন। (মুুুসলিম)

তাছাওউফের দলীল
মুসলিম শরীফে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর মাধ্যমে বর্ণিত ‘হাদীসে জিবরাঈলে’ জিবরাঈল আলাইহিস সালাম কর্র্তৃক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে যে প্রশ্ন করা হয় তার জবাবে রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে উত্তর দেন তা হলো-
فاخبرني عن الاحسان قال ان تعبد الله كانك تراه فان لم تكن تراه فانه يراك- الحديث ( مسلم
অর্থাৎ আপনি আমাকে ‘ইহসান’ সম্পর্কে বলুন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত কর যেন (ইবাদত করা অবস্থায়) তাঁঁকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তাঁকে দেখতে না পাও তাহলে (মেনে নাও) তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন। (মুুুসলিম)
‘ইহসান’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে সুন্দর করা। অর্থাৎ ইবাদতকে এমনভাবে সম্পাদন করা, যা সব ধরণের অমনযোগিতা বা লোকদেখানো থেকে মুক্ত।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ইহসানে’র সংজ্ঞায় বললেন, তুমি এমনভাবে আল্লাহ তায়ালার ইবাদত কর যেন তাঁকে তুমি দেখতে পাচ্ছ অর্থাৎ যদি তুমি আল্লাাহ তায়ালাকে দেখা অবস্থায় তাঁর সামনে ইবাদত করতে, তাহলে যেরূপ ইবাদত করতে ঠিক অনুরূপ ইবাদত কর। আর তখন ইবাদতে কোন ধরণের অমনযোগিতা বা লোকদেখানো বিষয় থাকবে না বরং ইবাদতে মনোযোগ বা একনিষ্ঠতা আবশ্যকীয়ভাবে পরিলক্ষিত হবে। আর যদি তাঁকে তুমি দেখতে নাও পাও তাহলে মনে রাখবে, তিনি তোমাকে দেখছেন।
‘ইহসান’ সম্পর্কিত প্রশ্নটি জিবরাঈল আলাইহিস সালাম ‘ঈমান’ ও ‘ইসলাম’ সম্পর্কিত প্রশ্নের পরে করেছিলেন। এর দ্বারা বুঝা যায় আক্বীদা-বিশ্বাস বা প্রকাশ্য আমলের পর আরো একটি জরুরী বিষয় অর্জন করা আবশ্যক। যাকে হাদীসের পরিভাষায় ‘ইহসান’ বলা হয়েছে। আর এবিষয়টিই তরীকতপন্থীগণ সুচারুরূপে সম্পাদন করেন। সারকথা হলো এর নামই তাছাওউফ। সুতরাং হাদীসের মাধ্যমেই তরীকত তথা ইলমে তাছাওউফের বিষয়টি সাব্যস্ত হলো।
বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় শাহ্ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমতল্লাহি আলাইহি ইমাম মালিক রহমতল্লাহি আলাইহির বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন-
قال الامام مالك رحمه الله من تصوف و لم يتفقه فقد تزندق و من تفقه ولم يتصوف فقد تفسق ومن جمع بينهما فقد تحقق (مرقاة المفاتيح
যে ব্যক্তি তাছাওউফের জ্ঞান অর্জন করল, ফিকহর জ্ঞান অর্জন করল না সে যিনদীক্ব; আর যে কেবল ফিকহর জ্ঞান অর্জন করল তাছাওউফের জ্ঞান অর্জন করল না সে ফাসিক। আর যে এর উভয়টিই শিখল সে মুহাক্কিক বা সত্যানুসন্ধানী হলো।
এ প্রসঙ্গে শাহ্ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলবী রহমতুল্লাহি আলাইহি اشعة اللمعات গ্রন্থে উল্লেখ করেন-
بدانكه بنائے دين وكمال آن بر فقه و كلام وتصوف است و اين حديث شريف بيان اين ہر سہ مقام كرده اسلام اشارت به فقه است كه متضمن بيان اعمال واحكام شرعيه است وايمان اشارت باعتقادات كه مسائل اصول كلام اند واحسان اشارت به اصل تصوف است كه عبادت از صدق توجه الي الله است وجميع معاني تصوف كه مشائخ طريقت بآن اشارت كرده اند راجع بهمن معني است وتصوف وكلام لازم يكديگراند كه ہيچ يكے بے ديگر تمام نه پزيرد چرا كه كلام بے تصوف و تصوف بے فقه نه بنند زيرا كه حكم الهي بے فقه شناخته نه شود و فقه بے تصرف تمام نشود وزيرا كه عمل بے صدق توجه تمام نه پزيرد وهر دو بے ايمان صحيح نگردد بر مثال روح وجسد ہيچ كدام بے ديگر وجود نگیرد و كمال نه پزيرد (اشعة اللمعات :٤١-٤٢
-“জেনে রাখ যে, ধর্মের ভিত্তি ও পূর্ণতা হচ্ছে ইলমে ফিকহ, ইলমে কালাম ও ইলমে তাছাওউফ। এই হাদীসে উল্লেখিত তিনটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে। ‘ইসলাম’ শব্দ দ্বারা ইলমে ফিকহ উদ্দেশ্য; কেননা এতে আমল এবং আহকামে শরীয়ত অন্তর্ভূক্ত। ‘ঈমান’ শব্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আকীদা-বিশ্বাস যা কালাম শাস্ত্রের বিষয়বস্তু। আর ‘ইহসান’ শব্দের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাছাওউফ। যার অর্থ খাটি মনে আল্লহ তায়ালার দিকে তাওয়াজ্জুহ বা মনোনিবেশ করা। তরীকতের শাইখগণ যে সকল বক্তব্য পেশ করেছেন তার সারকথা হলো এই ‘ইহসান’। তাছাওউফ ও কালাম শাস্ত্র একে অপরের সাথে জড়িত। একটি ছাড়া অপরটি পরিপূর্ণ হয় না। এর কারণ হলো কালাম শাস্ত্র ছাড়া তাছাওউফ এবং তাছাওউফ ছাড়া কালাম শাস্ত্র অর্থহীন। কেননা খোদায়ী বিধিবিধান ফিকহ ব্যতীত জানা যায় না; আর তাছাওউফ ব্যতীত ইলমে ফিকহ পরিপূর্ণ হয় না। আবার কোন আমলই একনিষ্ট তাওয়াজ্জুহ বা খাটি নিয়ত ছাড়া পরিপূর্ণ হয় না। আর এতদোভয়ের কোনটিই ঈমান ব্যতীত বিশুদ্ধ হয় না।” (আশিয়্যাতুল লুমআত)
তাছাওউফ দ্বীনের অংশ। অংশকে বাদ দিলে পূর্ণ বস্তুর অনুপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে যায়। সুতরাং তাছাওউফকে অস্বীকার করলে দ্বীনকে অস্বীকার করা অপরিহার্য হবে।
হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তিনটি উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা পয়গম্বরগণকে পাঠিয়েছেন; তা হলো ১. আকীদা শুদ্ধকরণ, ২.আমল শুদ্ধকরণ ও ৩.এখলাছ তথা আন্তরিকতা শুদ্ধকরণ-
وقد تكفل بفن الاول اهل الوصول من علماء الامة و قد تكفل بفن الثاني فقهاء الامة فهدي الله بهما اكثرين و قد تكفل بفن الثالث الصوفية رضوان الله عليهم (التفهيمات الالهية
অর্থাৎ বিশ্বাস বা আক্বীদা সংশোধনের দায়িত্ব নিয়েছেন উলামায়ে উছুল বা নীতিশাস্ত্রবিদ আলিমগণ, আমল সংশোধনের দায়িত্ব ফকীহগণের এবং এখলাছ তথা আন্তরিকতা সংশোধনের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ছুফী বুযুর্গগণ।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি আরো বলেন, ‘ইসলামে তাছাওউফ দেহে আত্মার ন্যায়’। তিনি বলেন-
والذي نفسي بيده هذا الثالث ادق المقاصد الشرعية مأخذا و اعمقها مهتدا و هو بالسنة الي سائر الشرائع بمنزلة الروح من الجسد و بمنزلة المعني من اللفظ- (التفهيمات الالهية
সেই সত্তার কসম, যার কব্জায় আমার প্রাণ। এই তৃতীয় শাস্ত্রটি শরীয়তের উদ্দেশ্যের উৎস হিসেবে খুবই সুক্ষ এবং হেদায়াত হিসেবে খুবই গভীর। তাই সকল শরীয়তের জন্য এই শাস্ত্রের মর্যাদা দেহের আত্মা এবং শব্দের জন্য অর্থ স্বরূপ। (তাফহীমাত)
ইখলাছ ও ইহসান নামে অভিহিত তৃতীয় এই শাস্ত্রটি সমগ্র শরীয়তের প্রাণ ও আত্মা। আত্মা ছাড়া যেমন দেহ অর্থহীন অনুরূপ ইখলাছ ব্যতীত আকাঈদ ও আমল অর্থহীন। আর এরই অপর নাম তাছাওউফ। তাছাওউফ ব্যতীত না শরীয়ত জীবিত থাকতে পারে, না দ্বীন নিরাপদ থাকতে পারে। শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বিষয়টি পরিস্কার করে দিয়েছেন।
হযরত কাজী সানাউল্লাহ পানিপথী রহমতুল্লাহি আলাইহি সূরা তাওবার وما كان المؤمنون لينفروا كافة আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে তাফসীরে মাযহারীতে তাছাউফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন এভাবে-
واما العلم اللدني الذي يسمون اهلها بالصوفية الكرام فهو فرض عين لان ثمراتها تصفية القلب عن اشتغال بغير الله تعالي واتصافه بدوام الحضور وتزكية النفس عن رذائل الاخلاق من العجب والكبر والحسد وحب الدنيا والكسل في الطاعات وايثار الشهوات والرياء والسمعة وغير ذلك وتجليتها بكرام الاخلاق من التوبة والرضا بالقضا والشكر علي النعماء والصبر علي البلاء وغير ذلك- ولا شك ان هذه الامور محرمات وفرايض علي كل بشر اشد تحريما من معاصي الجوارح واهم افتراضا من فرايضها فالصلوة والصوم وشيء من العبادات لايعبأ بشيء منها ما لم تقترن بالاخلاص والنية- (التفسير المظهري)
অর্থ: ইলমে লাদুন্নী অর্জনকারী ব্যক্তিদেরকে সুফী বলা হয় থাকে। আর ইলমে লাদুন্নী অর্জন করা ফরযে আইন। এই শাস্ত্রের ফল হচ্ছে গাইরুল্লাহর যিকির থেকে অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখা, অন্তরকে সার্বক্ষণিক উপস্থিত রাখা, মন্দ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তথা অহংকার, অহমিকা, হিংসা, দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা, ঝাঁকঝমক প্রীতি, আল্লাহর আনুগত্যে অলসতা, কামনা-বাসনা, রিয়া ও খ্যাতি ইত্যাদি বিষয় থেকে অন্তরকে রক্ষা করা। এর আরো উপকারিতা হচ্ছে, উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করা, তৎসঙ্গে গুনাহ থেকে তাওবাহ করা, আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং বালা-মুছিবতে ধৈর্য ধারণ করা ইত্যাদি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, উপরে বর্ণিত বিষয়গুলি হারাম এবং মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুনাহের চাইতেও অধিকতর হারাম। পাশাপাশি নামায, রোযা ও অন্যান্য ইবাদত অপেক্ষাও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ফরয। কেননা যে কোন ইবাদত ইখলাছ ও বিশুদ্ধ নিয়ত ব্যতীত নিষ্ফল। (মাযহারী)
আর নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়ার নামই হলো তাছাওউফ।
ইমাম গাযযালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
وكذلك يفترض عليه علم احوال القلب من التوكل والخشية والرضا (تعليم المتكلمين)
-(অন্য সকল শাস্ত্রের ন্যায়) ইলমে তাছাওউফ বা অন্তরের অবস্থাবলী তথা তাওক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা, খাশিয়্যাত বা খোদাভীতি এবং রেযা বিল কাযা বা আল্লাহর ফায়সালায় সন্তুষ্ট থাকার জ্ঞান অর্জন করাও ফরয।
ইমাম গায্যালী রহমতুল্লাহি আলাইহির সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে তাছাওউফের জ্ঞান অর্জন করা ফরযে আইন। মাওলানা আশরাফ আলী থানবী সাহেব তার التكشف عن مهمات التصوف কিতাবে তাছাওউফ শিক্ষা করাকে ফরযে আইন সাব্যস্ত করেছেন।
আল্লামা ইবনু আবেদীন আশ্-শামী রহমতুল্লাহি আলাইহি অন্তরের অবস্থাসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করে ফল বের করেছেন যে,
فيلزمه ان يتعلم منها ما يري نفسه محتاجا اليه وازالتها فرض عين(رد المحتار)
অর্থাৎ অন্তরের কুস্বভার দূর করার জন্য তাছাওউফ এতটুকু অর্জন করবে, যতটুকু নিজের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করবে। আর অন্তরের কু-স্বভাব দূর করা ফরযে আইন। (রদ্দুল মুহতার)
তাফসীরে জুমালে উল্লেখ করা হয়েছে-
والدين الذي لا يقبل التغير هو التوحيد والاخلاص والايمان بما جائت جميع الرسل عليهم السلام
অর্থাৎ যে দ্বীন পরিবর্তন কবুল করে না, তা হচ্ছে তাওহীদ, ইখলাছ ও নবী-রাসূলগণ আনীত বিষয়াদির প্রতি ঈমান আনা।
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় তাছাওউফ তথা ইখলাছ ও ইহসান দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদির অন্যতম। ইখলাছ ছাড়া তাওহীদ যেমন গ্রহণীয় নয় অনুরূপ ঈমান আমলও গ্রহণীয় নয়।
হযরত শাহ্ আব্দুল আযিয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীয়ত ও তরীক্বত। তারা এদুটি বিষয়কেই বুযুর্গীর মূল বিষয় মনে করেন। (তুহফায়ে ইসনা আশারিয়্যাহ)
এ থেকে বুঝা গেল যারা তাছাওউফকে অস্বীকার করে তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের দলভূক্ত নয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ও সুফীগণ তাছাওউফ ও তাছাওউফের আক্বীদা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছেন। এটা সূফীগণের সর্বসম্মত চলার পথ। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে এতে যে সব ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে অনুসন্ধানকারীগণ তা সংশোধন করে দিয়েছেন।
তাছাওউফ ও সুলূক তাওয়াতুর পদ্ধতিতে প্রমাণিত। সর্বযুগেই অগণিত অসংখ্য ব্যক্তি তাছাওউফ চর্চায় নিমজ্জিত ছিলেন, বর্তমানেও রয়েছেন। আর তা এমন বিপুল সংখ্যক লোকের পরম্পরাগত বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যারা জ্ঞানে, আমলে, সংসার অনাসক্তিতে ও তাক্বওয়া-পরহেযগারীতে নযীরবিহীন। কাজেই এমন গুণসম্পন্ন অগণিত লোকের মিথ্যার উপর একমত হওয়া অসম্ভব।
عن جابر رضي الله عنه قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم العلم علمان فعلم في القلب فذلك العلم النافع وعلم علي اللسان فذلك حجة علي الله علي ابن ادم – رواه الدارمي والمنذري
وفي رواية العلم علمان فعلم ثابت في القلب وعلم في اللسان فذلك حجة علي عباده (رواه الديلمي والبيهق
-হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, ইলম দুই প্রকার। এক প্রকার ইলম অন্তরে প্রতিষ্ঠিত থাকে যা উপকারী ইলম। অপর প্রকার ইলম জিহ্বায় যা আদম সন্তানের দলিল। (হাদীসখানা দারিমী ও মুনযিরী বর্ণনা করেছেন।)
বর্ণিত হাদীসের ব্যাখ্যায় মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
قد يحمل الاول علي علم الباطن والثاني علي علم الظاهر (مرقاة المفاتيح
অর্থাৎ প্রথম প্রকার ইলম হচ্ছে ইলমে বাতিন আর দ্বিতীয় প্রকার ইলম হচ্ছে ইলমে যাহির।
প্রকৃতপক্ষে ইলমে বাতিনই হচ্ছে ইলমে তাছাওউফ।
তরীকতের বাইয়াত
عن عوف بن مالك الاشجعي رضي الله عنه قال: كنا عند النبي صلي الله عليه وسلم تسعة او ثمانية او سبعة فقال الا تبايعون رسول الله صلي الله عليه فبسطنا ايدينا و قلنا علي ما نبايعك يا رسول الله صلي الله عليه وسلم قال علي ان تعبدوا الله و لا تشركوا بالهتنا شيئا و تصلوا الصلوات الخمس و تسمعوا و تطيعوا و اسر كلمة خفية قال ولا تسئلوا الناس شيئا فلقد رأيت بعض اولئك النفر يسقط سوط احد هم فما يسئل احدا يناوله اياه (مسلم وابو داود والنسائي
-হযরত আউফ ইবনে মালিক আশযায়ী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নয়জন অথবা আটজন অথবা সাতজন ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সান্নিধ্যে উপস্থিত ছিলাম। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদেরকে) বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসুলের নিকট বাইয়াত গ্রহণ করবে না? আমরা আমাদের হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা কোন বিষয়ে বাইয়াত গ্রহণ করব? তিনি বললেন তোমরা এই বিষয়ে বাইয়াত গ্রহণ করবে যে, তোমরা আল্লাহ তথা তোমাদের প্রতিপালকের সাথে কোন কিছুকেই অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়বে, (শরীয়তের বিধান) শুনবে এবং মান্য করবে। একটি কথা নিম্নস্বরে বললেন । বললেন, মানুষের নিকট কোন কিছু প্রার্থনা করবে না। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি এই সকল ব্যক্তিদের মধ্যে কাউকে এমনও দেখেছি যে, তাদের কারো চাবুক পড়ে যাওয়ার পরও কাউকে তা উঠিয়ে দেয়ার জন্য বলতেন না। (মুসলিম, আবু-দাউদ ও নাসাঈ)
বর্ণিত হাদীসে বাইয়াত গ্রহণের স্পষ্ট দলীল বিদ্যমান। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামগণকে সম্বোধন করে একথা বলেছেন, সেহেতু এটি ইসলাম গ্রহণের নিমিত্তে বাইয়াত নয়। তাছাড়া হাদীসে-বর্ণিত বিষয়বস্তুর দ্বারা বুঝা গেল, ইহা জিহাদের নিমিত্তেও বাইয়াত নয়। বরং হাদীসের ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইহা আমল করার প্রতি গুরুত্ব প্রদান ও সার্বক্ষণিক আমলে নিমজ্জিত থাকার বাইয়াত। আর উহাই হলো তরীকতের বাইয়াত।
এ প্রসঙ্গে শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাঁর রচিত القول الجميل কিতাবে বলেন-
فاعلم ان البيعة سنة لا واجبة لان الناس بايعوا النبي صلي الله عليه وسلم و تقربوا بها الي الله (القول الجميل)
“জেনে রাখ, বাইয়াত গ্রহণ করা সুন্নত; ওয়াজিব নয়। কেননা সাহাবায়ে কিরামগণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করেছেন এবং এর মাধ্যমে তারা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ করেছেন।”
প্রশ্ন জাগতে পারে বাইয়াত শরীয়ত সম্মত হওয়ার কারণ কি? উত্তরে বলা যায়, আল্লাহ তায়ালার চিরন্তন নিয়মানুসারে মানুষের সকল কথা ও কাজ অন্তরে গোপন থাকে। বাহ্যিক কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেমন- আল্লাহ, ফেরেশ্তা, আসমানী কিতাব ইত্যাদি বিষয়ে বিশ্বাস অন্তরে গোপন থাকে। মৌখিকভাবে উচ্চারণের মাধ্যমে এ বিশ্বাস প্রকাশিত হয়। অনুরূপভাবে পাপ কার্য থেকে বিরত থাকার জন্য তওবাহ করার বাসনা ও সৎ কার্যাবলী সম্পাদন করার ইচ্ছাও অন্তরে গোপন থাকে। আর এসকল ইচ্ছা ও অভিব্যক্তিগুলোকে একজন কামিল পীর বা মুরশিদের নিকট প্রকাশ করার মাধ্যমই হলো বাইয়াত। বাইয়াত গ্রহণের মাধ্যমে মানুষ তার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যাবতীয় দোষ স্বীকার করে নেয় ও সদগুণাবলী অর্জনের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয় যা একজন মহাজ্ঞানী বা পন্ডিত ব্যক্তিও কামিল পীরের নিকট মুরীদ হওয়া ও তাঁর সাহচর্য ব্যতীত ইলমে তাছাওউফের কিতাব পাঠ করার মাধ্যমে অর্জন করতে পারবে না।
عن عبادة بن الصامت رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلي الله عليه وسلم و حوله عصابة من اصحابه بايعوني علي ان لا تشركوا بالله و لا تسرقوا- الحديث (متفق عليه واللفظ للبخاري)
হযরত উবাদা ইবনে ছামিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চারপাশে একদল সাহাবী উপস্থিত ছিলেন, আর সেই সময় তিনি বলেন, তোমরা আমার নিকট বাইয়াত গ্রহণ কর যে, তোমরা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না এবং চুরি করবে না। (বুখারী ও মুসলিম)
এই হাদীসের ভাষ্য দ্বারাও বুঝা যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাদেরকে বাইয়াত গ্রহণের জন্য সম্বোধন করেছিলেন তারা সকলেই সাহাবী ছিলেন। আর সাহাবায়ে কিরামগণ ইসলাম গ্রহণ ও জিহাদের বাইয়াত ছাড়াও গুনাহের কাজ থেকে বেচেঁ থাকা ও সার্বক্ষণিক আল্লাহর আনুগত্যে লিপ্ত থাকার জন্য বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। বর্ণিত হাদীসের সর্বশেষ অংশ হল فبايعناه علي ذلك অর্থাৎ আমরা এই সকল বিষয়ে বাইয়াত গ্রহণ করলাম। আর সুফিগণ একেই তরীকতের বাইয়াত বলেন।
প্রখ্যাত সুফী আল্লামা জালালুদ্দীন রূমী বলেন,
بر نويس احوال پير راه داں
বর নবীস আহওয়ালে পীরে রাহে দাঁ
پير را بگزين و عين راه داں
পীরে রা বুগযীনো আইনে রাহে দাঁ
অর্থ: তরিকত-অবহিত পীরের অবস্থাদি লিখে নাও, পীরের হাতে বাইয়াত গ্রহণ কর এবং তাকেঁ হুবহু তরীকতের পথ মনে কর।
پير را بگزيں كہ بے پير ايں سفر
পীরে রা বুগযীঁ কে বেপীর ঈঁ সফর
ہست بس پر آفت وخوف و خطر
হাস্ত বাস পোর আফত ও খওফ ও খতর।
অর্থ: পীরের ওয়াসিলা অবলম্বন কর, কেননা পীর ব্যতীত তরীকতের সফর ভয়াবহ আপদ-বিপদ, ভয়ভীতি ও সঙ্কটে পূর্ণ।
آں رہے كہ بارہا تو رفتہ
আঁ রাহে কে বারহা তূ রফতাঈ
بے قلاوز اندر آں آشفتہ
বে কালাউয আন্দর আঁ আশুফতাঈ।
অর্থ: যে পথে তুমি বহুবার গমন করেছ, পথপ্রদর্শক সাথে না থাকায় নানাবিধ অসুবিধায় উপনীত হয়েছো।
پس راه را كہ نديدستي تو ہيچ
পাছ রাহে রা কে নাদিদাস্তী তূ হীচ্
ہيں مرو تنہا ز رہبر سر مپیچ
হীঁ মারাও তন্হা যে রাহবর সার মপীচ।
অর্থ: অতএব, যে পথ তুমি কখনো দেখনি, সে পথে কখনো একা গমন করো না এবং পথপ্রদর্শককে কখনো উপেক্ষা করো না।
ہر كہ او بے مرشدے در راه شد
হার কে উ বে মুরশিদে দর রাহ শুদ
او ز غولاں گمره و در چاه شد
উ যে গোঁলা গোমরাহ ও দর চাহ শুদ।
অর্থ: যে ব্যক্তি মুরশিদ ব্যতীত তরীকত বা সুলুকের পথ চলল, সে শয়তানের চক্রান্তে পথভ্রষ্ট ও কূপে পতিত হলো।
گر نباشد سايہ پير اے فضول
গার নাবাশাদ সায়ায়ে পীর আয় ফুযুল
بس ترا سرگشتہ دارد بانگ غول
বস তোরা সর গাশতা দারাদ বাঙ্গে গুল।
অর্থ: হে প্রিয় বৎস! তোমার উপর যদি মুরশিদের ছায়া না থাকে, তবে শয়তানের ওয়াসওয়াসাহ্ তোমাকে সর্বদা অস্থির করে রাখবে।
-মুফতি মোঃ গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী,
লেখকের ”তাসাউফ বিষয়ক সুক্ষ্ম অলোচনা” নামক বই থেকে সংগ্রহিত