প্রবন্ধ

All right reserved by the author & the respective writers

4 মিনিট পড়ার সময়

ঘুমের চেয়েও যা কিছু উত্তম: ফজরের দুই রাকাত কেন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ

দুনিয়ার সব ঐশ্বর্য, হীরা-জহরত, নীল সমুদ্র আর বিশাল পাহাড় সব একদিকে রাখুন। অন্য পাল্লায় রাখুন ফজরের দুই রাকাত সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি হাদিসে এই অভাবনীয় তুলনার কথা বলা হয়েছে।

মোহাম্মদ আব্দুল আজিম
ঘুমের চেয়েও যা কিছু উত্তম: ফজরের দুই রাকাত কেন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ

গৌরচন্দ্রিকা

বাইরের জগৎটা এখন বড় বেশি মায়াবী। নিঝুম রাত শেষ হয়ে কেবল একটি ধূসর ভোর আসছে। জানালার ওপাশে কুয়াশার ঘন চাদর। আপনার শরীর উষ্ণ কম্বলের ওম ছেড়ে একচুল নড়তে চাইছে না। ঠিক তখনই দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত সম্মোহনী ডাক: “আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম।” ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।

এটি কি স্রেফ একটি বাক্য? নাকি এক রহস্যময় অজানার আহ্বান? অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমের সাগরে ডুব দিয়ে থাকে, তখন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ কেন এই পরম আরাম বিসর্জন দিয়ে শীতল জলের স্পর্শে জেগে ওঠে? ফজরকে অবহেলা করে আমরা আসলে যে কী বিশাল এক প্রাপ্তি হারিয়ে ফেলছি, তা হয়তো আমাদের স্থূল উপলব্ধিতেই আসে না।

পৃথিবী ও তার রাজত্ব একদিকে, ফজরের দুই রাকাত অন্যদিকে

দুনিয়ার সব ঐশ্বর্য, হীরা-জহরত, নীল সমুদ্র আর বিশাল পাহাড় সব একদিকে রাখুন। অন্য পাল্লায় রাখুন ফজরের দুই রাকাত সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর একটি হাদিসে এই অভাবনীয় তুলনার কথা বলা হয়েছে। দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চেয়েও এই দুই রাকাত সুন্নতের ওজন অনেক বেশি। সহিহ মুসলিমের একটি উদ্ধৃতি আমাদের এই অঙ্কটি বুঝিয়ে দেয়:

“ফজরের দুই রাকাত (সুন্নত) দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চেয়েও উত্তম।” — সহিহ মুসলিম

একবার থেমে ভাবুন। কোটি কোটি ডলার, সাত সমুদ্র আর তেরো নদীকেও ছাড়িয়ে যায় এই দুই রাকাত প্রার্থনার মূল্য। এর চেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ একজন মানুষের জন্য আর কী হতে পারে?

আল্লাহর বিশেষ জিম্মাদারি বা সিকিউরিটি প্রোফাইল

আমরা সারাদিন কতশত বিমা আর নিরাপত্তার চিন্তায় অস্থির থাকি। অথচ দিন শুরু করার আগেই যদি মহাবিশ্বের সর্বশক্তিমান অধিপতি স্বয়ং আপনার নিরাপত্তার ভার গ্রহণ করেন? সহিহ মুসলিমের ৬৫৭ নম্বর হাদিস আমাদের সেই অভাবনীয় নিশ্চয়তার কথা জানায়। যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করল, সে সরাসরি আল্লাহর জিম্মাদারি বা নিরাপত্তার বলয়ে ঢুকে পড়ল।

দিন শুরু করার জন্য এর চেয়ে বড় কোনো সিকিউরিটি প্রোফাইল কি এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আছে? এটি কেবল শরীর বা সম্পদের নিরাপত্তা নয়, এটি আপনার হৃদয়ের প্রশান্তিরও এক পরম নিশ্চয়তা।

এক অদৃশ্য সভার সাক্ষী: যেখানে ফেরেশতারা একত্রিত হন

এই নিরাপত্তার নেপথ্যে কাজ করে এক অদৃশ্য সভা। রাত ও দিনের ফেরেশতারা যখন পালাবদল করেন, তখন তারা ফজরের সময় এক জায়গায় মিলিত হন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলছেন —

“নিশ্চয়ই ফজরের কুরআন পাঠ প্রত্যক্ষ করা হয়।” — সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭৮

দৃশ্যটি কল্পনা করুন। শীতল ভোরে আপনি যখন জায়নামাজে দাঁড়িয়ে সূরা তিলাওয়াত করছেন, তখন আকাশ থেকে নেমে আসা নূরানী ফেরেশতারা আপনার কক্ষের কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখছেন। তারা অপলক নেত্রে আপনার বিনীত সেজদা প্রত্যক্ষ করছেন। ফেরেশতাদের সেই নিঝুম সম্মেলনে আপনার নামটি উচ্চারিত হচ্ছে। এটি এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক দৃশ্য যা সচরাচর চোখে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।

মুনাফিকদের কঠিন পরীক্ষা ও ঈমানি বিজয়

ফজর ও এশার নামাজ হলো মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ শরীর তখন গভীর ঘুম আর আরাম খোঁজে। এই সময়ে নিজের নফস বা কুপ্রবৃত্তির গলা টিপে ধরে যারা বিছানা ছাড়েন, তারাই মূলত দিনের প্রথম বিজয়ী। বিছানা ছেড়ে শীতল ওজুতে অবগাহন করা আপনার চারিত্রিক দৃঢ়তার এক চূড়ান্ত প্রমাণ। ঘুমের মায়া ত্যাগ করা মানেই হলো ঈমানি লড়াইয়ের ময়দানে দিনের প্রথম বিজয় নিশান ওড়ানো।

সারারাত ইবাদতের সওয়াব মাত্র কয়েক মিনিটে

আমাদের এই ছোট আর অতি ব্যস্ত জীবনে সারারাত জেগে ইবাদত করা অনেকের জন্যই অসম্ভব। কিন্তু ইসলাম আমাদের জন্য এক চমৎকার ‘শর্টকাট’ বা সহজ পথ রেখেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদিসের যুক্তি অনুযায়ী, যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতে পড়ল সে যেন অর্ধেক রাত নামাজ পড়ল। আর যে ব্যক্তি ফজরও জামাতে পড়ল, সে যেন পুরো রাত জেগে নামাজ পড়ার সওয়াব পেয়ে গেল।

মাত্র কয়েক মিনিটের এই হাজিরায় পুরো রজনীর ইবাদতের পূর্ণতা পাওয়া যায়। ব্যস্ত মানুষের জন্য এটি এক বিশাল সৌভাগ্য।

সকালের অভ্যাস পরিবর্তনের ৭টি দাওয়াই

ফজরের অভ্যাস গড়ে তোলা এক ধরনের তিতো কিন্তু কার্যকরী ওষুধের মতো। এর জন্য সাতটি দাওয়াই নিচে দেওয়া হলো —

1. রাতে অহেতুক আড্ডা বা মোবাইল ব্যবহার বাদ দিয়ে দ্রুত বিছানায় যাওয়া।

2. ঘুমানোর আগে খুব দৃঢ়ভাবে মনে মনে এই সংকল্প করা যে আমি ফজরে উঠবই।

3. অ্যালার্ম ঘড়ি বা ফোনটি হাতের নাগাল থেকে দূরে রাখা, যাতে তা বন্ধ করতে বিছানা ছাড়তে হয়।

4. সুন্নত অনুযায়ী ওজু করে ঘুমানোর অভ্যাস করা এবং ঘুমানোর আগে ডিজিটাল স্ক্রিন এড়িয়ে চলা।

5. ঘুম ভাঙার পর ‘আর মাত্র ৫ মিনিট’ এই মোহময় চিন্তাকে কঠোরভাবে দমন করা।

6. পরিবারের কাউকে দায়িত্ব দেওয়া, যেন তারা আপনাকে স্নেহের সাথে অথবা শাসন করে জাগিয়ে দেয়।

7. কোনোদিন ভুলবশত নামাজ ছুটে গেলে হতাশ না হয়ে জেগে ওঠার সাথে সাথেই তা আদায় করা এবং পরের দিন আরও জেদ নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া।

উপসংহার: আপনি কি সেই ডাক শুনছেন?

পুরো বিষয়টি তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ফজর হলো দিনের সেই চাবিকাঠি যা আপনার পুরো জীবনকে বরকতময় করে তুলতে পারে। একটিবার ভাবুন তো, পৃথিবীর কোনো ভিআইপি বা অতি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ যদি আপনাকে খুব ভোরে দেখা করার দাওয়াত দিতেন, আপনি কি বারবার অ্যালার্ম বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকতেন?

যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, যার দেওয়া প্রতিটি নিশ্বাস আমরা গ্রহণ করছি, সেই পরম রবের আহ্বান কি তার চেয়েও কম গুরুত্বের? ফজর ছাড়া একজন মুমিনের সকাল অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আগামীকাল যখন মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের সেই মায়াবী সুর আপনার কানে পৌঁছাবে, তখন মনে রাখবেন: ঘুম নয়, বরং স্রষ্টার সাথে সেই নিভৃত আলাপনই আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ। আপনি কি সেই ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত?

শেয়ার করুন